January 19, 2026

পরম্পরার প্রকৃত উত্তরাধিকারী প্রয়াত শুভাংশু সিংহের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য


Posted on January 19, 2026 by Syamal Das

পিতার নাম করুণা কৃষ্ণ সিংহ। করুণা কৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯১৫ খ্রীষ্টাব্দে মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর খানার পাঁচগ্রাম গ্রামে। তাঁর পিতার নাম ছিল নলিনীকান্ত সিংহ। পাঁচগ্রাম স্কুল থেকে ম্যাট্রিক ও কৃষ্ণাথ কলেজ থেকে আই.এ., ও কলকাতার রিপন কলেজ (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে প্রথম বিভাগে স্নাতক হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এম.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৩৯ খ্রীষ্টাব্দে বহরমপুরে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কর্মজীবন শুরু করেন। পরের বছর নন্দিতা নিবন্ধনের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়ে সংসারজীবনে প্রবেশ।

কর্মজীবনের প্রথম থেকেই অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৬৪ খ্রীষ্টাব্দে কমিউনিস্ট পার্টির বিভাজন মেনে নিতে না পেরে পার্টির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক ছিন্ন করে একনিষ্ঠভাবে মন দেন আইনী পেশায়। দেওয়ানি ও ফৌজদারি দুই বিভাগেই ছিলেন পারদর্শী। ১৯৭৬-৭৭ খ্রীষ্টাব্দে ছিলেন জেলার বার লাইব্রেরির চেয়ারম্যান। voracious reader আইনজীবী সহকর্মীদের মধ্যে encyclopaedia বলে পরিচিত। ফুটবল খেলোয়াড়ও ছিলেন করুণা কৃষ্ণ সিংহ। তাঁর ষষ্ঠ পুত্র ছিলেন শুভাংশু সিংহ। তাঁর জন্ম ১৯৪১ খ্রীষ্টাব্দের ২৭ নভেম্বর মাতুলালয় কান্দিতে। মাতামহ ছিলেন কান্দির প্রসিদ্ধ ফৌজদারি আইনজীবী ক্ষিতীশচন্দ্র যোশ। পিতার মতো জীবনের প্রায় সব গুণগুলি লাভ করেছিলেন শুভাংশু। বহরমপুর কৃষ্ণাথ কলেজিয়েট স্কুলের প্রাইমারি বিভাগ থেকে এবং কৃষ্ণাথ কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৫৮ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর বহরমপুর কৃষ্ণাথ কলেজ থেকে আই.এস.সি. উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পরীক্ষায় পাশ করে ১৯৬৭ খ্রীষ্টাব্দে পিতার হাত ধরে বহরমপুর বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হিসেবে আইনজীবীর পেশায় যোগ দিয়েছিলেন শুভাংশু। পিতার আদর্শে স্বাধীন আইনজীবীর পেশায় থাকবেন বলে জুডিশিয়াল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও গভর্নমেন্ট চাকরি গ্রহণ না করে দেশের অসংখ্য বিচারপ্রার্থীর ন্যায় ও আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় কখনো অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর কখনো অ্যাডিশনাল গভর্নমেন্ট প্লিডারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মুর্শিদাবাদ জেলা স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের কর্ণধার হয়ে ও সামাজিক নানা কল্যাণকর সংগঠন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থেকে সুনামের সঙ্গে কর্মজীবনের অর্ধশত বর্ষ অতিবাহিত করলে সেই বার অ্যাসোসিয়েশন মহাসমারোহে তাঁর আইনজীবী জীবনের গোল্ডেন জুবিলি পালন করেছেন ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দের ৩ মার্চ। বহরমপুরের প্রাচীন প্রতিষ্ঠান রঙ্গকুঞ্জ ক্লাবের সভাপতি, খাগড়ার প্রসিদ্ধ রাধাশ্যাম মন্দিরের পাবলিক ট্রাস্টের সম্পাদক, সাহিত্য অনুরাগী নিপুণ বাংলা ও ইংরেজি লেখনীর জন্য আইনজীবী মহলে সমাদৃত অসাধারণ বক্তৃতায় পারদর্শী কবিতা ও ছোটগল্প লেখনীতে তিনি বহু পুরস্কার প্রাপ্ত এহেন পরম্পরার উত্তরাধিকারী শুভাংশু সিংহ চলে গেলেন গত ১ জানুয়ারি ২০২৩। রেখে গেলেন স্ত্রী, একমাত্র পুত্র সৌম্যকান্তি, পুত্রবধূ সুদীপ্তা ও দুই বিবাহিত কন্যা ও অসংখ্য বন্ধু আত্মীয় ও শুভানুধ্যায়ী। তাঁর একমাত্র সন্তান সৌম্যকান্তি সিংহ ও ছোট ভাই খৃষ্টি ভট্টাচার্য আইনজীবী।

করুণা কৃষ্ণ সিংহ ছিলেন আমার পিতামহ ও পিতা প্রয়াত পঞ্চানন দাসের আইনজীবী। আমাদের পরিবারের মামলা মোকদ্দমা তিনি করতেন। বাবাকে তাঁর ডাক নামেই পঞ্চ বা পঞ্চু বলে ডাকতেন। আমি ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বাবার হাত ধরে তাঁর খাগড়া বাড়ির চেম্বারে গিয়েছি। দিনের বেলা মানুষটি হেসে হেসে বাবার সঙ্গে কথা বলতেন। আবার সন্ধ্যায় (শুভাংশু সিংহ) উকিল হয়ে বাবার পাশে চেম্বারে বসতেন তখনও দেখেছি ছেলের সঙ্গেও কী বন্ধুর মতো কথা বলতেন। আবার ১৯৭৩ খ্রীষ্টাব্দে যখন আমি উকিল হয়ে বহরমপুর উকিল সভার সদস্য হয়েছি তখনও দেখেছি আমাকে তিনি পুত্রবৎ গ্রহণ করেছেন। শুভদা দাদার মতো স্নেহ করেছেন। দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলায় তাঁর সঙ্গে কখনো মতভেদ হলেও মনান্তর হত না। আমার শাশুড়ি মাতা ও শুভদার মা উভয়েই পাঁচগ্রামের কালা উচ্চ বিদ্যালয়ের বালিকা বিভাগের। শুভদার তৃতীয় কন্যা সুরভি। আমার স্ত্রী দীপালির সহপাঠিনী। এই সকল কারণে ওদের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক। আমার প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের অধ্যয়নকেন্দ্র “ইতিহাস পরিক্রমা”র তিনি ছিলেন গুণগ্রাহী। মাঝে মাঝে তিনি আমাদের কার্যক্রমের খোঁজখবর নিতেন। তাঁর বিদায়ে আমরা অধ্যয়নকেন্দ্রের পক্ষ থেকে আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাই।

— শ্যামল ও দীপালি দাস এবং ইতিহাস পরিক্রমা পরিবারের সকল সদস্য । ১১ জানুয়ারী, ২০২৬।

ওপরের ছবিটি শুভাংশু সিংহার সহকর্মী আইনজীবী নমিতা কুমার ধরের আইনজীবী হিসেবে অর্ধশত বর্ষ অতিক্রান্ত।

গোল্ডেন জুবিলি অনুষ্ঠানে বক্তব্যরত শুভাংশু সিংহার ছবি।


0