January 2026

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু – ভারতের সংবিধানে উজ্জ্বল উপস্থিতি


Posted on January 27, 2026 by Syamal Das

২৩ জানুয়ারী ৷ বাঙালী তথা ভারতবাসীর কাছে এক আবেগ মথিত দিন ৷ এই দিনেই জন্ম গ্রহণ করেছিলেন ভারতের সুসন্তান স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু৷নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে অতীতে যেমন হয়েছে বহু আলোচনা ও লেখা জোখা তেমনি হয়েছে বহু বিতর্কও৷ এই সকল আলোচনা  লেখা জোখা ও বিতর্কে  তাঁর জীবনের বহু দিকই হয়তো উঠে এসেছে কিন্তু সব দিকই যে উঠে এসেছে তা বলা যায়না৷ গবেষকদের গবেষনায় নিরন্তর উঠে আসছে নানা দিক৷

ভারতের সংবিধান ভারতবাসীর প্রায় আড়াইশো বছরের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক উৎকৃস্টতম ফসল৷  জাতীর জনক মহাত্মাগান্ধীর পরিকল্পনায় প্রায় আড়াই বছর ধরে দুশো আটান্নজন  জনপ্রতিনিধির বিতর্ক সভায় আলোচনার পর যে সংবিধান গ্রন্থ রচিত হয়েছিল তাকেই বিদেশ থেকে নিয়ে আসা মূল্যবান বার্চ পেপারে দিল্লির প্রেমবিহারী রায়জাদাকে দিয়ে ক্যালিগ্রাফি করে লিখিয়ে নিয়ে শান্তিনিকেতনের কলা ভবনে ভারতশিল্পী নন্দলাল বোসকে দিয়ে ইল্যুমানেশন ও ইলাসস্ট্রেশন করিয়ে নিয়ে ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর ভারতীয়েদের দ্বারা তা গৃহিত হলে সকল ভারতবাসী নিজেদেরকে সেই সংবিধানে সমর্পন করেছিলেন৷

এ হেন ভারতের সংবিধান প্রস্তুত হয়েছিল মহাত্মাজীর পরিকল্পনায়   আড়াই শতাধিক জনপ্রতিনিধি নিয়ে গঠিত সংবিধান প্রস্তুতি কমিটির সভায় ১৯৪৬ খ্রীস্টাব্দের ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বরের মধ্যে৷ ওই সংবিধান গ্রন্থ ভারত সরকার দ্বারা নোটিফায়েড হয় ১৯৫০ সালের ১০ মে৷

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে গ্রেট বৃটেনের শাসক সম্প্রদায়ের ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে কথাবার্তা সম্পূর্ণ হয়ে যায়৷ ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত গোল টেবিল বৈঠকে তা চূড়ান্ত রূপ পায়৷ গান্ধিজীর পরিকল্পনায়, উপদেশে ও ব্যবস্থাপনায় ভারতে তৈরি হয় কনস্টিটিউয়েন্ট এসেমব্লি৷ ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর মাসের ৯ তারিখে নতুন দিল্লিতে বসে কনস্টিটিউয়েন্ট এসেমব্লির প্রথম বৈঠক৷ কতিপয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতাদর্শগত অমিল হওয়ায় গান্ধিজী শুধু কংগ্রেসই ত্যাগ করেননি, তিনি এমনকি তাঁর হাতে গড়া কনস্টিটিউয়েন্ট এসেমব্লিতেও যোগদান করেননি৷ গান্ধিজীর অবর্তমানে ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ হয়েছিলেন কনস্টিটিউয়েন্ট এসেমব্লির চেয়ারম্যান৷ প্রায় বছর  তিনেক ধরে নানা অধিবেশন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যে দিয়ে ১৯৪৯ সালের নভেম্বর মাসে সম্পূর্ণভাবে রচিত হয়ে যায়  ভারতের সংবিধান৷ রচিত সংবিধান ক্যালিগ্রাফ করে লিখিয়ে নেওয়া হয় দিল্লির প্রেম বিহারী নারায়ণ রায়জাদাকে দিয়ে৷ প্রেম প্রায় একমাস পরিশ্রম করে ২৫৪ টি কলমের হ্যান্ডেল ও ৩০৩ টি নিব ব্যবহার করে  কোন  পারিশ্রমিক  না নিয়ে রচিত সংবিধানকে ক্যালিগ্রাফ করে লিখে দেন৷ ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারী সকাল ১১ টায় গণপরিষদের অধিবেশন বসে৷ প্রায় তিন ঘন্টা সময় লাগে ২৫৮ জন প্রতিনিধির স্বাক্ষর করতে৷ এর পর  ভারতের রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদের নির্দেশে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ঐ স্বাক্ষরিত সংবিধানকে অলঙ্কৃত করতে সংবিধান গ্রন্থকে নিয়ে যান পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলায় অবস্থিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে ভারত শিল্পী নন্দলালের কাছে৷ নন্দলাল বোস তখন  কলাভবনের অধ্যক্ষ৷ ১৯৩৫ সাল থেকে কংগ্রেসের প্রায় সকল অধিবেশনের প্রদর্শনী হয়ে এসেছে নন্দলালের তত্বাবধানে৷ ভারতের মর্মবাণী একমাত্র নন্দলালের ছবিতেই ফুটে উঠত৷ গান্ধিজী বলতেন নন্দলাল তাঁর থেকেও বড় দার্শনিক৷ তাঁর ছবিতে গান্ধিজীর দর্শন যত জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠত গান্ধিজী মানুষকে অত প্রাণবন্ত ভাবে বোঝাতে পারতেন না বলে গান্ধিজীর ধারণা ছিল৷ গান্ধি–রবীন্দ্রনাথের ভাব শিষ্য নন্দলাল বোস তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে  মাসাধিককালের পরিশ্রমে সংবিধানগ্রন্থের ইল্যুমিনেশন ও ইলাস্ট্রেশনস্ করে দেন৷ ইলাস্ট্রেশনে ফুটে উঠে জাতির জনক মহাত্মাগান্ধির ভারতীয় গণতন্ত্রের ঐতিহ্যবাহী পাঁচ হাজার বছরের ক্রমান্বয়ী দার্শনিক ব্যাখ্যা৷ ইলাস্ট্রেশনস্ এ যেমন আছে ভারতীয় সভ্যতার আদি নিদর্শন মহেঞ্জোদারো হরপ্পার সিলমোহর, তেমনি আছে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বা ভারতের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অবস্থানের নিদর্শন গান্ধিজীর ডান্ডি বা নোয়াখালি যাত্রার বা দেশের বাইরে গিয়ে মাতৃভূমিকে মুক্ত করার নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর গৌরবজনক ভূমিকার ছবি৷ মূল সংবিধান গ্রন্থের ১৬০ পাতায় উনিশ চ্যাপ্টারে ১৫ সেন্টি মিটার চওড়া ৬ সেন্টিমিটার উচ্চতা বিশিস্ট নেতাজী সুভষ চন্দ্র বোসের ছবি৷ দ্বীতিয় বিশ্ব যুদ্ধের আবহে ১৯৪৫ সালে জাপানের সাহায্য নিয়ে আজাদ হিন্দ বাহিনী সহ সাবমেরিনে সমুদ্রপথে মণিপুরের ইম্ফলে উপস্থিত হয়ে ভারতের মাটিতে নেতাজী সুভষ চন্দ্র বোস জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে ভারতকে স্বধীন রাস্ট্র ঘোষনা করে জাতীয় পতাকাকে অভিবাদন করেন৷ওই ছবিই উৎকীর্ণ হয়েছে ভারতের মূল সংবিধান গ্রন্থের ১৬০ পাতায় নন্দলাল বোসের ইলাস্ট্রেশনস্-এ৷ ইলাস্ট্রেশনে লেখা আছে “রেভোলিউসনারী মুভমেন্ট ফর ফ্রিডম, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস এন্ড আদার পেট্রিয়টস ট্রায়িং টু লিবারেট মাদার ইন্ডিয়া ফরম আউট সাইড ইন্ডিয়া’  

সংবিধান গ্রন্থের মাপজোকঃ

মলাটের বাহির চওড়া– ১ ফুট ১ ইঞ্চি দুই সূতো বা ৩৩ সেন্টিমিটার, মলাটের বাহির লম্বা – ১ ফুট সাড়ে চার ইঞ্চি বা সাড়ে ৪১ সেন্টিমিটার ৷ মলাটের ভিতর বইয়ের পাতা লম্বা – ১ ফুট ৪ ইঞ্চি বা ৪০ সেন্টিমিটার, চওড়া – ১ ফুট বা ৩০ সেন্টিমিটার৷ বইয়ের পাতার বর্ডার এরিয়া চওড়া – সাড়ে ৯ ইঞ্চি বা ২৪ সেন্টিমিটার, বইয়ের পাতা বর্ডার এরিয়া লম্বা ১ ফুট ১ ইঞ্চি দুই সূতো বা ৩৩ সেন্টিমিটার৷

২৩১ পাতার সুদৃশ্য অলঙ্কৃত প্রতিটি পরিচ্ছদের প্রথমে একটি করে ছবি আঁকা যা ওই পরিচ্ছদের অর্ন্তনিহিত অর্থ প্রকাশ করে৷ বাইশটি পরিচ্ছদে বাইশটি ছবি বা ইলাশস্ট্রেশনস্ এর মধ্যে ফুটে উঠেছে ভারতবর্ষের গণতন্ত্রের পাঁচ হাজার বছরের ধারাবাহিক ইতিহাস৷ নিঃসন্দেহে ওই পরিকল্পনা ছিল জাতির জনক মহাত্মা গান্ধির৷ মহাত্মাজীর আজন্ম লালিত দার্শনিক ব্যাখ্যাই প্রতিফলিত হয়েছে ভারতীয়দের দ্বারা গৃহীত ওই ক্যালিগ্রাফ সংবিধানে৷

স্বাক্ষরিত মূল সংবিধান গ্রন্থ দুটি ক্যালিওগ্রাফ করা হয়েছিল একটি ইংরাজী ও একটি হিন্দিতে৷ স্বাক্ষরিত হয়েছিল দুটি গ্রন্থই৷ দীর্ঘ দিন ধরে সংবিধান গ্রন্থ দুটি ছিল জাতীয় অভিলেখ্যাগারে৷ ২০০৬ সালে সংসদ ভবনে সংবিধান প্রণয়ন কমিটি ও সংবিধান সংক্রান্ত বিষয়ে পার্লামেন্ট মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময়ে মূল সংবিধান গ্রন্থ দুটি সংসদ ভবনে আনা হয়৷ তখন থেকেই ঐ গ্রন্থ দুটি, থেকে গিয়েছে সংসদ ভবনে৷ বর্তমানে এগুলি আছে লোক সভার মাননীয় স্পিকারের হেফাজতে৷

ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরী ঐ সংবিধান গ্রন্থ দুটি সংরক্ষণ করে৷ ১৯৪৬ সালের ৯ ডিসেম্বর থেকে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সভা শুরুর পর প্রায় তিন বছর ধরে ঐ কমিটিতে নির্বাচিত ২৬৫ জন সদস্যের মধ্যে আলাপ আলোচনা ও বিতর্কের পর ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর ভারতের সংবিধান ভারতীয়দের দ্বারা অনুমোদিত ও গৃহীত হয় এবং ২৫৮ জন সদস্যের ঐ সংবিধানে স্বাক্ষর করার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয়রা  পবিত্র ঐ সংবিধানে নিজেদেরকে সমর্পণ করেন৷

সংবিধান  ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর  ভারতীয়দের দ্বারা গৃহীত হয়েছিল  ঐ দলিলে   স্বাক্ষর করেছিলেন সংবিধান প্রস্তুতি কমিটির চেয়ারম্যান ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ, জওহরলাল নেহেরু, ডঃ আম্বেদকার থেকে শুরু করে প্রায় ২৫৮ জন জনপ্রতিনিধি,  সংবিধানের বাইশটি পরিচ্ছদের  পাতায় অলঙ্কৃত ও ছবি প্রকাশিত হয়েছিল জাতির জনক  মহাত্মা গান্ধির ভারতের পাঁচ  হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী গণতন্ত্রের  দার্শনিক ব্যাখ্যা মেনে, যে দার্শনিক ব্যাখ্যা সঠিক ভাবেই প্রতিভাত হয়েছিল গান্ধি – রবীন্দ্রনাথের ভাবশিষ্য বাঙালী শিল্পী নন্দলাল বোসের তুলির টানে ৷

আসল সংবিধানের ২২২ পাতা থেকে ২৩১ পাতায় যে ২৫৮ জন সংবিধান প্রস্তুতি কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর আছে, তার মধ্যে শ্রী লক্ষ্মীকান্ত মৈত্র, শ্রী সুরেন্দ্র মোহন ঘোষ, শ্রী গিরিজা শঙ্কর গুহ প্রমুখ তিনজন বাঙ্গালী বাংলায় স্বাক্ষর করে ছিলেন৷

ভারতের সংবিধান গ্রন্থের চিত্রসূচী

১) মহেঞ্জোদারো যুগ – মহেঞ্জোদারো শীলমোহর দ্বারা অলঙ্কৃত-পৃষ্টা – ১, ২) বৈদিক যুগ – বৈদিক আশ্রম গুরুকুলের চিত্র – পৃষ্ঠা –৩ ৩) এপিক যুগ, রামায়নের চিত্র– (লঙ্কাবিজয়ের পর রামের সীতা উদ্ধার) পৃষ্ঠা –  ৬, ৪) এপিক যুগ, মহাভারতের চিত্র (শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে গীতার বাণী শোনচ্ছেন)পৃষ্ঠা – ১৭, ৫) মহাজনপদ ও নন্দ যুগ (চিত্রে বুদ্ধের জীবন)– পৃষ্ঠা – ২০,                                              ৬) মহাজনপদ ও নন্দ যুগ (চিত্রে মহাবীরের জীবন)– পৃষ্ঠা – ৬৩, ৭) মৌর্যযুগ – বুদ্ধের বাণী সমগ্র ভারতবর্ষে ও বিদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সম্রাট অশোকের উদ্যোগ– পৃষ্ঠা – ৯৮,                                                                                  ৮) গুপ্ত যুগ – (গুপ্ত যুগের কলা চিত্র তার উন্নতি – বিভিন্ন সময়ে) পৃষ্ঠা   – ১০২, ৯) বিক্রমাদিত্যের রাজসভার চিত্র  – পৃষ্ঠা    – ১০৪, ১০) প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে নালান্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র পৃষ্ঠা – ১০৫, ১১) মধ্যযুগের ওড়িশার ভাস্কর্য      পৃষ্ঠা    – ১০৬, ১২) মধ্যযুগের নটরাজের প্রতিমূর্তি ৷ পৃষ্ঠা   – ১১৩,১৩) মধ্যযুগের মহাবলিপূরমের ভাস্কর্য– ভগীরথের গঙ্গা আনয়ন   পৃষ্ঠা – ১৩০, ১৪) মুসলিম যুগ – মুঘল চিত্রকলায় আকবর পৃষ্ঠা – ১৩২,১৫) চিত্রে শিবাজী ও গুরু গোবিন্দ সিং পৃষ্ঠা – ১৪১, ১৬) বৃটিশ যুগ – চিত্রে টিপু সুলতান ও লক্ষ্মীবাঈ (বৃটিশ রাজের বিরূদ্ধে উত্থান)পৃষ্ঠা – ১৪৪,১৭) ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন,চিত্রে জাতির জনক,গান্ধিজীর ডান্ডি যাত্রা পৃষ্ঠা – ১৪৯, ১৮) বাপুজী শান্তির দূত নোয়াখালিতে দাঙ্গা – অধ্যুষিত এলাকায় তাঁর পরিভ্রমন পৃষ্ঠা – ১৫৪,১৯)স্বাধীনতার জন্য বৈপ্লবিক আন্দোলন, নেতাজী সুভষচন্দ্র বোস এবং অন্যান্য দেশ–প্রেমীগণ যাঁরা ভারতের বাইরে থেকে মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে চেষ্টা করেছিলেন৷ পৃষ্ঠা – ১৬০, ২০) অন্যান্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট ৷ হিমালয়ের চিত্র – পৃষ্ঠা – ১৬৭, ২১) ঐ ৷ মরুভূমির চিত্র – পৃষ্ঠা – ১৬৮, ২২) ঐ৷ সমুদ্রের চিত্র – পৃষ্ঠা – ১৮১, বৈদেশিক বাণিজ্য

গান্ধি–রবীন্দ্রনাথের ভাব শিষ্য নন্দলাল বোস তাঁর প্রায় ত্রিশজন ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে প্রায় একমাসের পরিশ্রমে সংবিধানের ইলাস্ট্রেশনস্ করে দেন৷  ইলাস্ট্রেশনে ফুটে উঠে জাতির জনক মহাত্মা গান্ধির ভারতীয় গণতন্ত্রের ঐতিহ্যবাহী পাঁচ হাজার বছরের ক্রমান্বয়ী দার্শনিক ব্যাখ্যা৷ ইলাস্ট্রেশনে যেমন আছে ভারতীয় সভ্যতার আদি নিদর্শন মহেঞ্জোদারো – হরপ্পার সিলমোহর, আছে প্রাচীন ভারতে নাগরিকদের গড়ে তোলার পিঠস্থান “গুরুকুল’ “বৈধ স্বামীর তস্করের কবল থেকে বৈধ স্ত্রীকে উদ্ধার করার মৌলিক অধিকার’ বা “রাস্ট্র নীতিকি হবে তার নির্দেশ’ বা “ভারতের প্রাচীন যোগীর জ্ঞান লব্ধ নির্দেশিকা যা ভারতের সমাজজীবনে প্রথম আইন বলে কথিত’ তেমনি আছে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বা ভারতের সাম্প্রদায়িক  সম্প্রীতির অবস্থানের নিদর্শন গান্ধিজীর ডাণ্ডি বা নোয়াখালি যাত্রার বা দেশের বাইরে গিয়ে মাতৃভূমিকে মুক্ত করার  নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের গৌরব জনক ভূমিকার ছবি৷

আমাদের সংবিধানের পার্ট ২8 (বিবিধ) এর চিত্রগুলি ১৬০ পৃষ্ঠায় নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু এবং অন্যান্য প্যাট্রিয়টস ভারতের বাইরে মায়েদের মুক্ত করার চেষ্টা করছে '। এটি ভারতের সংবিধানের চিত্রগুলির ধারাবাহিক সংখ্যা ১৯-এর অন্তর্ভুক্ত এবং 'বিপ্লবী আন্দোলন ফর ফ্রিডম' হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। আন্দোলনের মূল অংশ মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অহিংস পথে পরিচালিত হয়, অন্য অংশটি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু এবং অন্যান্য দেশপ্রেমীগণ ভারতের বাইরে মায়েদের মুক্ত করার চেষ্টা করে। কংগ্রেসের 'পূর্ণাভের' সিদ্ধান্তের আগে কয়েকজন দেশপ্রেমিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভারতকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন। খুদিরাম ও প্রফুল্ল চকি; বিনয়-বাদল-দীনেশ; ভগত সিং,সাভারকর ইত্যাদি। কংগ্রেস শুরু করে ভারত ছাড় আন্দোলন, কিন্তু কিছু নেতৃস্থানীয় শিল্পকেন্দ্রের চাপ দ্বারা কংগ্রেস আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয়। গান্ধী আন্দোলন স্থগিত করতে চেয়েছিলেন। ১৯৩৮ সালে সুভাষ চন্দ্র বসু কংগ্রেসের সভাপতির প্রথম জাতীয় পরিকল্পনা কমিটি গঠন করেন। ফেডারেশন ধারণাটি ১৯৩৫ সালের আইনের প্রতিফলিত হয়েছিল। ফেডারেশনগুলির বিষয়টি কংগ্রেসের পুরোনো রক্ষিবাহিনী ও তাদের বামপন্থীদের মধ্যে একটি প্রধান ঝড়ের কারণ হয়ে ওঠে। গান্ধীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বোস ১৯৩৯ সালে আবারও নির্বাচনে মুখোমুখি হন এবং কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হন। অবশেষে বোস প্রধান নির্বাচিত এআইসিসি সদস্যদের অ-সহযোগিতার কারণে পদত্যাগ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় ১৯৩২ সালে। জুলাইয়ের ২১ তারিখে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি মুক্তি পান কিন্তু অবিলম্বে নজরদারি চালিয়ে যান। মধ্যরাতের ১৬-১৭ জানুয়ারি ১৯৪১ সালে তিনি কলকাতায় তাঁর এলগিন রোডের বাসভবন থেকে পালিয়ে পালিয়ে যান এবং প্রথমে রাশিয়ায় তারপর তিনি বার্লিন পৌঁছান। সুভাষ বসুকে তার মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য জার্মান সরকার বিশেষ সাহায্য করেননি। ক্যাপ্টেন মোহন সিং, মালয়েশিয়াতে জাপানী কর্তৃক গ্রেফতারকৃত ব্রিটিশ ভারত সেনাবাহিনীর পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একজন সামরিক কর্মকর্ত ছিলেন , তিনি ভারতকে মুক্ত করার জন্য ভারতীয় বাহিনী গড়ে তোলার জন্য ফুজওয়ারাকে সহযোগিতা করতে সম্মত হন। পরিশেষে আইএনএ গঠিত হয় এবং রাশ বিহারী বোস, জাপানের একটি প্রবীণ বাঙালি বিপ্লবী বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মোহন সিংকে অপসারণ করা হয় এবং সুভাষচন্দ্র বসু আইএনএর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। আইএন এ ১৯৪৫ সালের মধ্যে প্রায় চল্লিশ হাজার সৈনিক নিযুক্ত করেছিলেন। ১৮৫৭ খ্রীস্টাব্দের  বিখ্যাত কিংবদন্তি ঝাঁসির  রানীর  নামে একটি মহিলা রেজিমেন্টের নামকরণ করেন  বসু। জাপানের সহযোগিতায়  আই এন ও বাহিনী নিয়ে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস আসাম মণিপুর ও নাগাল্যান্ডের প্রায় ১৫০ স্কোয়ার মাইল বৃটিশ শাসন মুক্ত করে   ইম্ফলে স্বাধীন ভারতের তেৰঙ্গা পতাকা তুলে অভিবাদন করেন৷
ইলাস্টেটেড সংবিধান গ্রম্থের ব্যাপক প্রচার হয়নি বা সহজলভ্যও নয়৷ পঞ্চানন মন্ডল তাঁর ভারত শিল্পী নন্দলাল গ্রন্থের চতুর্থ খন্ডের ৬২৪ পৃস্টায় নন্দলালের জবানীতে লিখেছেন- “কনসটিটিউশন ইলাস্টে্শন৷ কংগ্রেস লিখে পাঠালেন৷ ভালো হাতে লিখে ছিল৷ তার ধারে ধারে ইলাস্টে্শন থাকবে ৷ ডেকোরেশন হবে ঐতিহাসিক ছবি দিয়ে৷ সে আর ছাপলনা ওরা৷..------- সুভাষের এ্যাড্রেস করলুম৷ ও ঈশানে আসছে ফ্ল্যাগ উড়িয়ে_সেটা লগিয়ে দিলুম৷’
সঙ্গের ছবিটি ২০০০ সালে ভারত সরকার প্রকাশিত সংবিধান গ্রন্থ থেকে নেওয়া৷

0

পরম্পরার প্রকৃত উত্তরাধিকারী প্রয়াত শুভাংশু সিংহের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য


Posted on January 19, 2026 by Syamal Das

পিতার নাম করুণা কৃষ্ণ সিংহ। করুণা কৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯১৫ খ্রীষ্টাব্দে মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর খানার পাঁচগ্রাম গ্রামে। তাঁর পিতার নাম ছিল নলিনীকান্ত সিংহ। পাঁচগ্রাম স্কুল থেকে ম্যাট্রিক ও কৃষ্ণাথ কলেজ থেকে আই.এ., ও কলকাতার রিপন কলেজ (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে প্রথম বিভাগে স্নাতক হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এম.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৩৯ খ্রীষ্টাব্দে বহরমপুরে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কর্মজীবন শুরু করেন। পরের বছর নন্দিতা নিবন্ধনের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়ে সংসারজীবনে প্রবেশ।

কর্মজীবনের প্রথম থেকেই অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৬৪ খ্রীষ্টাব্দে কমিউনিস্ট পার্টির বিভাজন মেনে নিতে না পেরে পার্টির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক ছিন্ন করে একনিষ্ঠভাবে মন দেন আইনী পেশায়। দেওয়ানি ও ফৌজদারি দুই বিভাগেই ছিলেন পারদর্শী। ১৯৭৬-৭৭ খ্রীষ্টাব্দে ছিলেন জেলার বার লাইব্রেরির চেয়ারম্যান। voracious reader আইনজীবী সহকর্মীদের মধ্যে encyclopaedia বলে পরিচিত। ফুটবল খেলোয়াড়ও ছিলেন করুণা কৃষ্ণ সিংহ। তাঁর ষষ্ঠ পুত্র ছিলেন শুভাংশু সিংহ। তাঁর জন্ম ১৯৪১ খ্রীষ্টাব্দের ২৭ নভেম্বর মাতুলালয় কান্দিতে। মাতামহ ছিলেন কান্দির প্রসিদ্ধ ফৌজদারি আইনজীবী ক্ষিতীশচন্দ্র যোশ। পিতার মতো জীবনের প্রায় সব গুণগুলি লাভ করেছিলেন শুভাংশু। বহরমপুর কৃষ্ণাথ কলেজিয়েট স্কুলের প্রাইমারি বিভাগ থেকে এবং কৃষ্ণাথ কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৫৮ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর বহরমপুর কৃষ্ণাথ কলেজ থেকে আই.এস.সি. উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পরীক্ষায় পাশ করে ১৯৬৭ খ্রীষ্টাব্দে পিতার হাত ধরে বহরমপুর বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হিসেবে আইনজীবীর পেশায় যোগ দিয়েছিলেন শুভাংশু। পিতার আদর্শে স্বাধীন আইনজীবীর পেশায় থাকবেন বলে জুডিশিয়াল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও গভর্নমেন্ট চাকরি গ্রহণ না করে দেশের অসংখ্য বিচারপ্রার্থীর ন্যায় ও আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় কখনো অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর কখনো অ্যাডিশনাল গভর্নমেন্ট প্লিডারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মুর্শিদাবাদ জেলা স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের কর্ণধার হয়ে ও সামাজিক নানা কল্যাণকর সংগঠন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থেকে সুনামের সঙ্গে কর্মজীবনের অর্ধশত বর্ষ অতিবাহিত করলে সেই বার অ্যাসোসিয়েশন মহাসমারোহে তাঁর আইনজীবী জীবনের গোল্ডেন জুবিলি পালন করেছেন ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দের ৩ মার্চ। বহরমপুরের প্রাচীন প্রতিষ্ঠান রঙ্গকুঞ্জ ক্লাবের সভাপতি, খাগড়ার প্রসিদ্ধ রাধাশ্যাম মন্দিরের পাবলিক ট্রাস্টের সম্পাদক, সাহিত্য অনুরাগী নিপুণ বাংলা ও ইংরেজি লেখনীর জন্য আইনজীবী মহলে সমাদৃত অসাধারণ বক্তৃতায় পারদর্শী কবিতা ও ছোটগল্প লেখনীতে তিনি বহু পুরস্কার প্রাপ্ত এহেন পরম্পরার উত্তরাধিকারী শুভাংশু সিংহ চলে গেলেন গত ১ জানুয়ারি ২০২৩। রেখে গেলেন স্ত্রী, একমাত্র পুত্র সৌম্যকান্তি, পুত্রবধূ সুদীপ্তা ও দুই বিবাহিত কন্যা ও অসংখ্য বন্ধু আত্মীয় ও শুভানুধ্যায়ী। তাঁর একমাত্র সন্তান সৌম্যকান্তি সিংহ ও ছোট ভাই খৃষ্টি ভট্টাচার্য আইনজীবী।

করুণা কৃষ্ণ সিংহ ছিলেন আমার পিতামহ ও পিতা প্রয়াত পঞ্চানন দাসের আইনজীবী। আমাদের পরিবারের মামলা মোকদ্দমা তিনি করতেন। বাবাকে তাঁর ডাক নামেই পঞ্চ বা পঞ্চু বলে ডাকতেন। আমি ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বাবার হাত ধরে তাঁর খাগড়া বাড়ির চেম্বারে গিয়েছি। দিনের বেলা মানুষটি হেসে হেসে বাবার সঙ্গে কথা বলতেন। আবার সন্ধ্যায় (শুভাংশু সিংহ) উকিল হয়ে বাবার পাশে চেম্বারে বসতেন তখনও দেখেছি ছেলের সঙ্গেও কী বন্ধুর মতো কথা বলতেন। আবার ১৯৭৩ খ্রীষ্টাব্দে যখন আমি উকিল হয়ে বহরমপুর উকিল সভার সদস্য হয়েছি তখনও দেখেছি আমাকে তিনি পুত্রবৎ গ্রহণ করেছেন। শুভদা দাদার মতো স্নেহ করেছেন। দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলায় তাঁর সঙ্গে কখনো মতভেদ হলেও মনান্তর হত না। আমার শাশুড়ি মাতা ও শুভদার মা উভয়েই পাঁচগ্রামের কালা উচ্চ বিদ্যালয়ের বালিকা বিভাগের। শুভদার তৃতীয় কন্যা সুরভি। আমার স্ত্রী দীপালির সহপাঠিনী। এই সকল কারণে ওদের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক। আমার প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের অধ্যয়নকেন্দ্র “ইতিহাস পরিক্রমা”র তিনি ছিলেন গুণগ্রাহী। মাঝে মাঝে তিনি আমাদের কার্যক্রমের খোঁজখবর নিতেন। তাঁর বিদায়ে আমরা অধ্যয়নকেন্দ্রের পক্ষ থেকে আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাই।

— শ্যামল ও দীপালি দাস এবং ইতিহাস পরিক্রমা পরিবারের সকল সদস্য । ১১ জানুয়ারী, ২০২৬।

ওপরের ছবিটি শুভাংশু সিংহার সহকর্মী আইনজীবী নমিতা কুমার ধরের আইনজীবী হিসেবে অর্ধশত বর্ষ অতিক্রান্ত।

গোল্ডেন জুবিলি অনুষ্ঠানে বক্তব্যরত শুভাংশু সিংহার ছবি।


0