আইনী পরিষেবায় ললিতমোহন— পাঁচ পুরুষই ‘পঞ্চরত্নের সমাহার’


Posted on August 8, 2026 by Syamal Das

উমাশঙ্কর ধর | কনক প্রভা ধর | সমীর কুমার ধর | বীথিকা ধর

কক্ষচ্যুত হলেন তৃতীয় রত্ন সমীর কুমার ধর।

ললিতমোহন থেকে পাঁচ পুরুষ ধরে আইনী পরিষেবা দিয়ে আসছেন সুবর্ণ বণিক সম্প্রদায় ভুক্ত বহরমপুরের এই ধর পরিবার। আইনী পরিষেবা দেওয়া শুরু সেই উনবিংশ শতাব্দী থেকে। ইউরোপীয় রেনেশাঁসের ঢেউ আমাদের এই মফস্বল শহরেও আলোর বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছিল। তা নাহলে মফস্বল শহরের এক ফৌজদারী আইনজীবী ধাইমার হাতে বাড়ীতে গোয়াল ঘরের পাশে আঁতুর ঘরে প্রসব করানোর যুগে রীতিমত সাহেব সিভিল সার্জেনকে বাড়ীতে ডেকে নিয়ে এসে নিজের চেম্বারকে অস্থায়ী ‘লেবাররুম’ বানিয়ে পাঁচমাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর পেটের টিউমার অপারেশন করিয়ে ছিলেন কোন সাহসে। সাহেব ডাক্তার ললিতমোহনের সহধর্মিনী পাঁচমাসের অন্তঃসত্ত্বা হেমন্তকুমারীদেবীর পেট কেটে পাঁচমাসের ভ্রুণকে চিনামাটির প্লেটে রেখে টিউমার অপারেশন করে সেই ভ্রুণকে পুনঃ স্থাপন করেছিলেন জননীর গর্ভে। যথাসময়ে ললিতমোহনের স্ত্রী হেমন্তকুমারী জন্মদিয়েছিলেন স্বাভাবিক ভাবেই এক পুত্র সন্তানের-উমাশঙ্কর— যে এই পৃথিবীর আলো দেখেছে দুবার। তাই অনেকেই তাঁকে দ্বিজ বলতেন— এটা আমাদের ছেলে বেলায় শোনা কথা। এই কাহিনীর সত্যতা শুনেছি উমাশঙ্কর বাবুর চেম্বারে গত শতাব্দীর আটের দশকে তাঁর জুনিয়র ল’ ইয়ার হিসাবে একান্তে কথা বলার সময়ে। প্রায় শতাব্দী পূর্বে ইউরোপীয় নবজাগরণের সৃষ্টি ‘ডেটল’ যখন মধ্যযুগের কুসংস্কার পবিত্র গঙ্গাজলের জায়গায় একশো গুণ হাইজেনিক হওয়া সত্ত্বেও এদেশে তার স্থান করে নিতে পারছিলনা সে সময় ললিতমোহন তাঁর কুসংস্কার মুক্ত মন নিয়ে কুসংস্কারের সমস্ত বাধাকাটিয়ে ‘ডেটল’কে ‘অ্যাকসেপ্ট’ করেছিলেন বলেই বহরমপুর তথা মুর্শিদাবাদ পেয়েছিল পাহাড় প্রমাণ উচ্চতার দেওয়ানী আইনজ্ঞ উমাশঙ্কর ধরকে। প্রায় দশবছর এই মানুষটির সঙ্গে অত্যন্ত কাছ থেকে দেখে আমার উপলব্ধিতে তিনি ছিলেন আগাগোড়া আইনী মানসিকতায় মোড়া।

প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে মুর্শিদাবাদ জেলাজজ কোর্টে দেওয়ানী প্রায় সমস্ত নিম্ন আদালতের ও আপীল আদালতের মোকদ্দমায় উমাশঙ্কর ধর এক পক্ষে ‘কম্পালসারী’। জয়লাভও করেছেন সহস্রাধিক মামলায়। মুর্শিদাবাদের সমস্ত গ্রাম গ্রামান্তরে প্রবাদ বাক্যের মত ধ্বনী প্রতিধ্বনী হয়ে ফিরেছে ‘উমাশঙ্কর ধর মানেই মোকদ্দমায় ডিগ্রি অবশ্যম্ভাবী’। উমাশঙ্কর বাবুকে মামলা দেওয়ার জন্য তাই বিবাদমান উভয়পক্ষই কাক ভোর থেকে ভীড় জমাতো তাঁর খাগড়া মোকামের চেম্বারের দরজায়। তিনি শুধু আইন পরিষেবায় দেননি সামাজিক জীবনেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক প্রবাদ পুরুষ। মহাকালী পাঠশালা, হিন্দুস্থান শিক্ষাভারতী সহ অনেকগুলি বিদ্যালয়, বহরমপুর উকিল সভা, সুবর্ণবণিক সমাজ সহ বেশ কতকগুলি সামাজিক সংগঠন, হিন্দুস্থান সেবা সমিতি, স্বর্গধাম সহ অনেকগুলি ক্লাবের তিনি ছিলেন সভাপতি। সভাপতিত্ব করেছেন ১৯৮৬ সালের ২য় সুবর্ণবণিক রাজ্য সম্মেলনে যেখানে প্রধান অতিথি ও বিশেষ সম্মানীয় অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন যথাক্রমে সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারপতি মুরারীমোহন দত্ত ও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ডঃ প্রতাপ চন্দ্র চন্দ্র।

কথায় বলে চ্যারিটি বিগিন্স অ্যাট হোম। ‘মেথডিক্যাল’ উমাশঙ্কর বাবু তাঁর চেম্বারে গড়ে তুলেছিলেন ১৯৬১ সালের অ্যাডভোকেট অ্যাক্টের রুল্স অনুযায়ী। গত শতাব্দীর আটের দশকে তাঁর ফিস ছিল ৬৪ টাকা। ছিল হিসাবের খাতা। তাঁর নামে জমা পরত ৫০ টাকা ও দুই পুত্র জুনিয়রের নামে ৫ যুক্ত ৫ দশ টাকা এবং মহুরী ও সেরেস্তার খরচ ৪ টাকা। শুনানীর টাকা একবার জমা পরলে কোন কারণে মোকদ্দমার দিন পড়েগেলে আর দ্বিতীয়বার শুনানীর টাকা নেওয়া হতো না। কখনই বিরোধী পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন হতো না। তাঁর সৃষ্ট শৃঙ্খলা পরায়ণ ওই সেরেস্তার কঠোর ভাবে তাঁর সময়কালে প্রায় অর্ধ শতক ধরে শৃঙ্খলা রক্ষা করে গিয়েছেন তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র-জুনিয়র সমীর কুমার ধর। যেমন ছিল শৃঙ্খলাপরায়ণ সেরেস্তা তেমনি ছিল তাঁর ‘গ্রন্থাগার’ আইন আর রুলিং এর এক বৃহৎ কালেকশন। কি নাই সেখানে আছে শতবর্ষ প্রাচীন প্রিভি কাউন্সিল, মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট ও অবিভক্ত ভারতের সমস্ত হাইকোর্টের রুলিং ও আইন যা এখনও এদেশের আইন জীবনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তীক্ষ্ণ মেধাবী উমাশঙ্কর বাবু তাঁর শত শত গ্রন্থরাজীর মধ্যে থেকে কোন গ্রন্থে কি আছে চোখ বুজে বলেদিতে পারতেন। তিনি আরগুমেন্ট করতেন টু দি পয়েন্ট। তাঁর আরগুমেন্টে থাকতনা কোন বাড়তি কথা বা বিতর্ক যাতে কোনভাবেই আদালতের সময় এক মিনিটও নষ্ট হতোনা। বেঞ্চের সঙ্গে তাঁর ছিল সুমধুর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।

কথায় বলে ‘বাপ কা বেটা, সিপাহী কা ঘোড়া’। জুনিয়র জেষ্ঠপুত্র সমীর কুমার ধর ছিলেন প্রায় উমাশঙ্কর বাবুর ডিটো। পিতার প্রায় সমস্ত গুণই অর্জন করেছিলেন সমীরবাবু পিতার ছায়া সঙ্গি ও প্রকৃত উত্তরাধিকারী হয়ে। উমাশঙ্কর বাবুর মত তিনিও ওকালতী জীবনের গোল্ডেন জুবলী অতিক্রম করেছেন। পিতার মতই ছিলেন ওই সকল সামাজিক সংগঠনের কর্ণধার ও বহরমপুর পৌর সভার কাউন্সিলার। তাঁর জীবনের অনুপুঙ্খ বর্ণনা করলে ‘রিপিটেশন’ হয়ে যাবে তাই বিরতি।

প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে প্রয়াত হয়েছেন উমাশঙ্কর ধর। পিতার মৃত্যু আগে প্রায় পঁচিশ বছর এবং এই পঁয়ত্রিশ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে ট্র্যাডিশন ধরে রেখেছিলেন ধর ডাইনেস্টির তৃতীয় রত্ন সমীর কুমার ধর। সমীর বাবু চলে গেলেন গত ২৬ জুলাই ২০২৬ মধ্যাহ্নে। কালের নিয়মে ধর ডাইনেস্টির পঞ্চরত্নের তৃতীয় রত্ন কক্ষচ্যুত হলেন। উমাশঙ্কর ধর স্কুলের অধ্যক্ষ এবার সিদ্ধার্থ শঙ্কর ধর— জেলার মুখ্য সরকারী আইনজ্ঞ হিসাবে ভারপ্রাপ্ত পিতার সঙ্গে ছায়া সঙ্গি হিসাবে কাজ করে এসেছেন বিগত দুই দশক ধরে— প্রায় এক দশক ধরে সঙ্গে নিয়ে চলেছেন ললিত মোহনের পঞ্চম পুরুষ পঞ্চম রত্ন পুত্র সার্থক শঙ্কর ধর-কে। উমা শঙ্কর ধর স্কুলের প্রায় এক দশক ছাত্র এই প্রতিবেদকের বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ ধর ডাইনেস্টির সেই সকল প্রয়াত রত্নকে যাঁরা রেখেগেলেন শৃঙ্খলাযুক্ত আইনী দর্শনের স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন এক ইনস্টিটিউশন যা পরবর্তী প্রজন্মকে পথ দেখাবে— রোধ করবে আইনজীবীদের একাংশের নৈতিক অধঃপতন।

শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনে – শ্যামল দাস, এ্যাডভোকেট ও তাঁর পরিবার বর্গ।

আগষ্ট ৫, ২০২৬ বহরমপুর


Uncategorized

0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Itihas Parikrama